রবিবার, ২১শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
৫ই জুলাই, ২০২০ ইং
১২ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী
ads

বাংলাদেশ পুলিশে যোগ হয়েছে ‘মানবিক ইউনিট’ একজন শওকত এর কারনে

দেশটুডে২৪ ডেস্ক: ‘এক টুকরা পেস্ট্রি অথবা মিষ্টি অথবা কেকের অংশ অথবা একটা কমলা তারা কতদিন চোখে দেখে নাই’, কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন পুলিশ কনস্টেবল শওকত।

নিজের জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শেয়ার করছিলেন তিনি। বলছিলেন, আজকে দশ বছর কোনো নতুন শার্ট আমি কিনি নাই। এটা যদি যাচাই করতে চান চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালের সমস্ত সিভিল স্টাফ, সমস্ত ডাক্তার, সমস্ত পুলিশ স্টাফ এবং আমার ফ্যামিলি মেম্বার আর আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে যদি জাস্টিফাই করেন তাহলে আরো ক্লিয়ার জানতে পাবেন। দশ বছরে আমার একটা নতুন শার্ট অথবা নতুন প্যান্ট নাই। আপনারা প্রশ্ন করেন তাহলে তুমি চলো কীভাবে?…’
তিনি ২০০৫ সালে পুলিশ বিভাগে যোগ দেন। নোয়াখালী ট্রেনিং সেন্টারে ২৪তম ব্যাচ হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন শওকত। তারপর কনস্টেবল হিসেবে কাজে যোগ দেন। কিন্তু এই চাকরি করতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। স্বপ্ন আর কল্পনার সাথে তিনি বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাননি। ‘আমার রাগ চলে আসতো মনের মধ্যে। আমি বাবাকে বলতাম। কয়েকবার ফোন করেছি যে, বাবা আমি আর পারবো না। আমার খুব অসুবিধা হচ্ছে। এই চাকরি আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। আমি চলে আসতেছি, আমি পারবো না আর’, বলতে থাকেন তিনি। তবে বাবা তাকে বোঝাতেন। ছয় মাসের প্রশিক্ষণ, চাকরি নেওয়ার পেছনে এত সময় ইত্যাদি নিয়ে বাবা ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। এতকিছুর পর মাত্র এক-দুই মাস চাকরি করার পর চলে আসার বিষয়টি বাবা চাইছিলেন না। সেই ২০০৫ সালে ২৮৫০ টাকা বেসিকে চাকরি শুরু করেন তিনি। সবকিছু মিলিয়ে ৫ হাজারের মতো বেতন পেতেন তিনি। এখন তিনি ২৫ হাজার টাকার মতো বেতন পান।

পরে তিনি নিজের ওপর চ্যালেঞ্জ নিলেন। এই চাকরি তাকে কত খাটাতে পারে আর তিনি কত খাটতে পারেন সেই চ্যালেঞ্জ নিলেন। ২০০৫-২০০৯ সাল পর্যন্ত ঢাকায় চাকরি করেন তিনি। এরপর চট্টগ্রাম পুলিশে তার পোস্টিং হয়। পুলিশে থাকা অবস্থাতেই তিনি বাংলাদেশ কারিগরি বোর্ডের অধীনে মেডিক্যালে তিন বছরের ডিপ্লোমা এবং দুই বছরের প্যারামেডিক্যাল কোর্স সম্পন্ন করেন।

২০০৯ সালে চট্টগ্রাম রেঞ্জ থেকে তার রাঙামাটিতে পোস্টিং হয়। আর মেডিক্যালে ডিপ্লোমা কোর্স থাকার কারণে ডেপুটেশনে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতাল হয় তার কাজের ঠিকানা। রাঙামাটি থেকে আহত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় সেখানে। ওই হাসপাতালে ওটিতে কাজেরও সুযোগ মেলে তার। সার্জারি ডাক্তারদের সহায়ক হিসেবে দায়িত্ব মেলে। ভালো কাজের সুবাদে একসময় ওটির ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পান।
এখানে এসে জীবনের নিদারুণ কিছু অভিজ্ঞতা হয় তার। ধীরে ধীরে একজন মানবিক পুলিশ হয়ে ওঠেন শওকত। বললেন, ‘যেমন একদিন দেখি একটা মানুষ ডাস্টবিনে পড়ে রয়েছে এবং তাকে পোকায় খেয়ে ফেলতেছে। তাকে তো আমি ফেলে আসতে পারি না। ওদিকে কেউ ভয়েও যায় না, লাশকাটা ঘরের পাশে। তারওপর পচা দুর্গন্ধ। অনেকে মনে করতেছে এটা কোনো পচা লাশের গন্ধ। আসলে ওটা জ্যান্ত মানুষ।’

ফরেনসিক নিয়ে তার আগ্রহ ছিল। এসব বিষয় নিয়ে কেবল বই পড়ে বোঝা যায় না। প্র্যাকটিকেল অভিজ্ঞতা নিতে হয়। দেহের নানা অংশ সম্পর্কে ধারণা পেতে তিনি ডোমঘরের কদম আলীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। তিনি ধীরে ধীরে এক্সপার্ট হয়ে ওঠেন। এখন তার হাত পানির মতো চলে।

পোকায় খাওয়া মানুষটিকে ধরে প্রথমে তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ‘কিন্তু বিবেকের কাছে পরাজিত হই। এই লোকটা যদি আমার আপন ভাই হতো তাহলে আমি কি করতাম?’ ডাস্টবিনে পড়ে থাকা মাঝবয়সী পুরুষ মানুষটা ক্ষুধার্ত ছিলেন। ভালো থাকা একটা হাত আর পা কিছুটা নাড়াতে পারছিলেন। বোঝাচ্ছিলেন তিনি কিছু খেতে চান। ‘আমি যতটুকু বুঝেছিলাম তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন, হাত নিয়ে মুখে দেখাচ্ছিলেন তিনি কিছু খাবেন’, বলেন শওকত। গ্লাভস কিনলেন তাকে ধরার জন্য। কিন্তু প্রমাণ সাইজের একটা মানুষকে তিনি কিভাবে একা বয়ে নিয়ে যাবেন? অনেককে ডেকেছেন। কিন্তু এমন অবস্থা দেখে কেউ আর এগিয়ে আসেননি। তারা ওই মানুষটিকে দেখে থুথু ফেলে চলে যান। এক ঘণ্টা ধরে অনুরোধ করেও তিনি কাউকে পাননি। পরে তিনি ফেরত যান। সেখান থেকে দুই সহকর্মীকে নিয়ে আসেন। একজন এখন কনস্টেবল এবং আরেকজন প্রমোশন পেয়ে এএসআই হিসেবে কর্মরত। তারা তিনজন মিলে এক ভ্যানগাড়িওয়ালাকে অনুরোধ করে নিয়ে আসেন। পরে কোনভাবে তাকে তুলে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেও ভর্তি করতে সমস্যা হচ্ছিল। অবশেষে নিজে অভিভাবক হয়ে তাকে ভর্তি করেন শওকত। সেখানে শুরু হয় তার ড্রেসিং আর চিকিৎসা। প্রতিদিন রাতে একবেলা তিনি খাবার দিয়ে আসতেন রোগীকে। তার খাবার নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকতেন সেই মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি। আবার কর্মব্যবস্ততায় কোনদিন তিনি খাবার নিয়ে না যেতে পারলে রোগী না খেয়েই থাকতেন। রোগীর ড্রেসিং তিনি নিজেই করতে থাকলেন, একটানা তিন-চার মাস ধরে। যা কামাই করতেন বেশিরভাগ টাকাই এই রোগীর পেছনে খরচ হচ্ছিল তার। মাঝে মাঝে খারাপ লাগতো। এই অচেনা অজানা মানুষটার পেছনে তিনি এত টাকা কেন খরচ করছেন? ‘কিন্তু যখন আমি তার কাছে যেতাম এবং সে আমার দিকে তাকিয়ে নিষ্পাপ হাসি দিতো, উপর আল্লাহ সাক্ষী, তখন আমার সব দুঃখ চলে যেতো। তখন আমার মনে হতো যে আমার পুরো বেতনটাই এর পেছনে দিলেও বিন্দুমাত্র আফসোস আসবে না। সে যে একটা জীবন ফেরত পেয়েছেন আর তার পেছনে আমি যে শ্রম দিয়েছি তাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।’ এখন সেই মানুষটি ভালো আছেন।

শেয়ার করুন:

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on whatsapp
Share on email
Share on print

আরও পড়ুন:

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৫৯,৬৭৯
সুস্থ
৭০,৭২১
মৃত্যু
১,৯৯৭

বিশ্বে

আক্রান্ত
১১,৩৩৯,৪৪১
সুস্থ
৬,৪১৬,৭৪২
মৃত্যু
৫৩২,১১৫

আর্কাইভ