বুধবার, ২১শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
৫ই আগস্ট, ২০২০ ইং
১৪ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী
ads

ফজলে হাসান আবেদ আর নেই

দেশটুডে২৪ নিউজ: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইমেরিটাস স্যার ফজলে হাসান আবেদ আর নেই। গত রাত ৮টা ২৮ মিনিটে তিনি রাজধানীর এ্যাপোলো হসপিটালসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে এ্যাপোলো হসপিটালসে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে, এক ছেলে ও তিন নাতি-নাতনি রেখে গেছেন। বিশ্ববরেণ্য এই সমবায় সংগঠকের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে তাঁর

অসংখ্য গুণগ্রাহী, শুভাকাক্সক্ষী ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা হাসপাতালে ছুটে যান। পরিবারের পাশাপাশি ব্র্যাক পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়,  ফজলে হাসান আবেদের লাশ এ্যাপোলো হসপিটালসের হিমঘরে রাখা হয়েছে। আজ শনিবারও হিমঘরে থাকবে। আগামীকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক সেন্টারে লাশ নিয়ে যাওয়া হবে। সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাঁর লাশ ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হবে। দুপুর সাড়ে ১২টায় সেখানেই নামাজে জানাজা সম্পন্ন হবে। এরপর বনানী কবরস্থানে লাশ দাফন করা হবে।

এদিকে ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যু সংবাদ শুনে এ্যাপোলো হসপিটালসে ছুটে যান শান্তিতে নোবেলজয়ী ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফজলে হাসান আবেদের চাচাতো ভাই ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন, অধ্যাপক আইনুন নিশাত, আইন ও সালিস কেন্দ্রের সিফা হাফিজাসহ ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ফজলে হাসান আবেদের ছেলে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। তিনি জানান, ‘বাবার মৃত্যুর সময় আমরা পরিবারের সবাই পাশে ছিলাম। তিনি ৩৬ বছর বয়সে ব্র্যাকের কার্যক্রম শুরু করেন। ’৭১-এ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। তাঁর সেই স্বপ্ন আজ মহিরুহে পরিণত হয়েছে। বাবা সব সময় বলতেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। তাঁর সব সময় ভাবনা ছিল দরিদ্র মানুষদের নিয়ে। আজ তিনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। দেশবাসীর কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘ফজলে হাসান আবেদ একজন আদর্শবান মানুষ ছিলেন। আজ আমরা সবাই তাঁর জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। তাঁকে নিয়ে আজ বাংলাদেশ গর্বিত। তিনি একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ ছিলেন। অন্তত ২৮টি দেশে ব্র্যাকের কার্যক্রম আমি লক্ষ্য করেছি। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আজ শুধু বাংলাদেশেরই নয়, সারা বিশ্বেই এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। আমরা একজন কিংবদন্তিকে হারালাম। এক জনমে তিনি সারা বিশ্বে এত কাজ করে গেছেন যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমরা তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।’

 

শোক জানালেন যাঁরা : স্যার ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের, বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন এমপি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি প্রমুখ।

একনজরে ফজলে হাসান আবেদ : ফজলে হাসান আবেদের জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে। দেশে ও বিদেশে শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ১৯৬২ থেকে ’৬৮ সাল পর্যন্ত লন্ডন, কানাডা ও আমেরিকায় চাকরি করেন। ’৬৮ সালে দেশে ফিরে আসেন। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্যার ফজলে হাসান আবেদ শেল অয়েল কোম্পানির উচ্চপদের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ইসলামাবাদ ও কাবুল হয়ে লন্ডনে চলে যান। মে মাসে লন্ডনে গিয়ে সমমনা বন্ধুদের সঙ্গে মিলে সম্পৃক্ত হন স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াইয়ে। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য গড়ে তোলেন ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ ও ‘হেলপ বাংলাদেশ’ নামে দুটো সংগঠন। ’৭১ সালের ডিসেম্বরে ফজলে হাসান আবেদ সদ্যস্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তিনি ভারতপ্রত্যাগত শরণার্থীদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনকল্পে কাজ শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া সুনামগঞ্জের শাল্লা ও দিরাই অঞ্চলকে তিনি তাঁর কর্মএলাকা হিসেবে বেছে নেন। ’৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাসিসটেন্স কমিটি সংক্ষেপে ‘ব্র্যাক’-এর শাল্লা প্রকল্পের প্রথম পর্বের সূচনা হয়। বর্তমানে ব্র্যাকের কার্যক্রম এশিয়া ও আফ্রিকার ১১টি দেশে বিস্তৃত। ব্র্যাকের প্রধান লক্ষ্য দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ক্ষমতায়ন। ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত টানা চার বছর জেনেভাভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সংস্থা ‘এনজিও অ্যাডভাইজার’ কর্তৃক ব্র্যাক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এনজিও হিসেবে স্বীকৃতি পায়। প্রভাব, উদ্ভাবনশীলতা, টেকসই সমাধান এ তিনটি বৈশিষ্ট্যের নিরিখে বিশ্বের ৫০০ এনজিওর মধ্যে তুলনার ভিত্তিতে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখায় স্যার ফজলে হাসান আবেদ অসংখ্য পুরস্কার ও স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে-  শিক্ষা উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পুরস্কার ‘ইদান প্রাইজ’ (২০১৯), প্রাক-শৈশব উন্নয়ন কর্মকাে  অসাধারণ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ লেগো ফাউন্ডেশন কর্তৃক লেগো পুরস্কার (২০১৮), দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সম্ভাবনা বিকাশে সুযোগ সৃষ্টির জন্য লুডাটো সি অ্যাওয়ার্ড (২০১৭), ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ (২০১৫), ট্রাস্ট উইমেন হিরো অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), স্প্যানিশ অর্ডার অব সিভিল মেরিট (২০১৪), লিও টলস্টয় ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মেডাল অ্যাওয়ার্ড (২০১৪), শিক্ষা ক্ষেত্রে ওয়াইজ প্রাইজ ফর এডুকেশন (২০১১), ডেভিড রকফেলার ব্রিজিং লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড (২০০৮), ক্লিনটন গ্লোবাল সিটিজেন অ্যাওয়ার্ড (২০০৭), ইউএনডিপি মাহবুবুল হক অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং কনট্রিবিউশন টু হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (২০০৪), ওলফ পামে প্রাইজ (২০০১) ও র‌্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফর কমিউনিটি লিডারশিপ (১৯৮০)।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অশোকা স্যার ফজলে হাসান আবেদকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি এর মর্যাদাসূচক গ্লোবাল একাডেমি ফর সোশ্যাল এন্ট্রাপ্রেনিওরশিপের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা কমিশন অন হেলথ রিসার্চ ফর ডেভেলপমেন্ট (১৯৮৭-৯০), ইনডিপেনডেন্ট সাউথ এশিয়ান কমিশন অন প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন (১৯৯১-৯২) ও হাইলেভেল কমিশন অন লিগ্যাল এমপাওয়ারমেন্ট অব দ্য পুওর (২০০৫-২০০৮)-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্যার ফজলে হাসান আবেদ ২০১০ সালে ব্রিটেনের রানী-প্রদত্ত নাইটহুড মর্যাদা লাভ করেন। ২০১০ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব কর্তৃক স্বল্পোন্নত দেশসমূহের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রখ্যাত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত পরামর্শদাতা দলের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। ২০১৪ ও ২০১৭ সালে ফরচুন ম্যাগাজিন কর্তৃক স্যার ফজলে হাসান আবেদ বিশ্বের শীর্ষ প্রভাবশালী ৫০ জন ব্যক্তিত্বের অন্যতম হিসেবে উল্লিখিত হন। স্যার ফজলে হাসান আবেদ এ বছর (২০১৯) নেদারল্যান্ডস রাজা কর্তৃক নাইটহুড উপাধিতে ভূষিত হন। ব্র্যাক গ্লোবাল বোর্ডের চেয়ারপারসন আমিরা হক তাঁর বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ফজলে হাসান আবেদের আত্মনিবেদন, কর্মনিষ্ঠা এবং সুদৃঢ় নৈতিক অবস্থান তাঁকে ব্র্যাক পরিবারের সবার কাছে শ্রদ্ধেয় “আবেদ ভাই” করে তুলেছে। মানুষকে মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি ছিল তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সততা, বিনয় এবং মানবিকতার এক বিরল দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। গত ৪৭ বছরে বহুবিস্তৃত কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ব্র্যাক বিশ্বের অন্যতম কার্যকর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়েছে। মাইক্রোফাইন্যান্স, সামাজিক ব্যবসা, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়নের লক্ষ্যে নানামাত্রিক বিনিয়োগ সমন্বয়ে ব্র্যাক আজ বিশ্বের বুকে একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান।’ স্যার ফজলে হাসান আবেদ ১৯৭২ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ও ২০০১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক ব্যাংকেরও প্রতিষ্ঠাতা। গত ১ আগস্ট ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাকের চেয়ারপারসন পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং চেয়ার ইমেরিটাস হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি ২৪ জুলাই ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন পদ থেকে এবং ২৬ আগস্ট ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারপারসন পদ থেকে অবসর নেন। এ ছাড়া তিনি দেশে-বিদেশে বহু সামাজিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

শেয়ার করুন:

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on whatsapp
Share on email
Share on print

আরও পড়ুন:

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
১৮,৭০২,৭৩৭
সুস্থ
১১,৯১৭,২৪৭
মৃত্যু
৭০৪,৩৬৫

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১