মঙ্গলবার, ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
৪ঠা আগস্ট, ২০২০ ইং
১৩ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী
ads

কম্পিউটার আবিষ্কারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিল যে যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ৩৫০০ বছর পুর্বে প্রাচীন ব্যাবিলিনরা বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ এর জন্য ক্লে ট্যাবলেট ব্যাবহার করতো। হিসেব নিকাশের জন্য গণনার কাজে মানুষ নিজের হাতের আঙ্গুল ব্যাবহার করেছে। নুড়ি, ছোট ছোট কাঠি, দড়ির গিট ইত্যাদি ব্যাবহার করে ঠিক রেখেছে হিসাব নিকাশ ।

birbangla.com

খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ বছর আগে মানুষ এ্যাবাকাস যন্ত্রের আবিষ্কার করে । বলা যায় এটাই প্রথম সংখ্যা ভিত্তিক বা ডিজিটাল গণনা যন্ত্র। জাপানে এই যন্ত্র কে “সরজন” নামে চিনে । মূলত এ্যাবাকাস হল আয়তকার একটি কাঠামো । এর মধ্যে কতগুলো তার আড়াআড়ি ভাবে বসানো থাকতো। উপরের প্রত্যেকটি পুতির মান ৫ আর নিচের পুতির মান গুলো ১। প্রতিটি তার আবার একক, দশক, শতক, হাজার বোঝায়। গণনা কাজে ঠিক সংখ্যার পুতি উপরের দইকে ঠেলে দিতে হতো ।

birbangla.com

এরপর ২০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে । ১৮৩৩-৩৪ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী চার্লস ব্যাবেজ যে ধারনা দেন , আধুনিক কম্পিউটারে সে অনিযায়ী প্রস্তুত করা হয় । তাই চার্লস ব্যাবেজ কে ” আধুনিক কম্পিউটারের জনক ” বোলা হয়। তিনি যে ধারনা দেন সে অনুযায়ী তিনি নিজে কম্পিউটার তৈরি করে যেতে পারেন নি । তবে তা পরবর্তি তে বাস্তব রূপ লাভ করেছে ।

birbangla.com

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী এল্যান টিউরিং আধুনিক কম্পিউটার গঠন কি রকম হওয়া উচিত , কেন এরকম হওয়া উচিত, এটির কর্ম ক্ষমতা কত দুর এবং কোথায় এর দুর্বলতা তার একটি সার্থক মডেল তিনি বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরেন। আজকের কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের মাঝে টিউরিং এর মেশিন (Turing Machine) নামে সমধিক প্রচলিত।

birbangla.com

এল্যান টিউরিং এর কম্পিউটার মডেলের বাস্তব রূপ দিলেন ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের জার্মান বিজ্ঞানী কনরাড জুস। তিনি আবিষ্কার করেন জেড- ওয়ান (z-1) নামক প্রথম প্রোগ্রাম চালিত যান্ত্রিক কম্পিউটার । সে বছর প্রথম ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটারের আদি রূপ তৈরি হয় ড. ভিনসেন্ট আট্যান্সফ এবং ক্লিফোর্ড বেরই নামক দুই মার্কিন বিজ্ঞানী কর্তিক । তাদের নাম অনুসারে কম্পিউটারের নাম করন করা হয় আট্যান্সফ বেরি কম্পিউটার যার সংক্ষেপ ABC

birbangla.com

১৯৪০-৪১ খ্রিস্টাব্দে জন মসিল নামক এক বিজ্ঞানী ABC কে আরও উন্নত করার জন্য আমেরিকার সামরিক বিভাগের ব্যালিস্টিক রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আবিষ্কার করে ” এনিয়াক ” (ENIAC) নামক কম্পিউটার যার ওজন ছিল ৩০ টন এবং আকৃতিতে ছিল ৩ টি বিশাল ঘর জুড়ে। এনিয়াক -ই ছিল পৃথিবীর প্রথম পুর্নাঙ্গ কম্পিউটার ।

birbangla.com

আধুনিক কম্পিউটার আবিষ্কার ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে। আর কম্পিউটারের ব্যাপক প্রচলন আরম্ভ হয় ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে পর প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কম্পিউটার বাজার জাত করা শুরু হয় । প্রথম কম্পিউটার ছিল বিশাল বড় যা শুধু আবিষ্কারক বাদে কেউ চালাতে পারতেন না । এ্যাবাকাস আবিষ্কারের বহু পরে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ থেকে ৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আবিষ্কৃত হয় ঘড়ি। সেই ঘড়ি কিন্তু নিজে নিজে চলতে পারতো না । তাকে চালানোর জন্য সহযোগিতার প্রয়োজন হত। কিন্তু মানুষের আশা যন্ত্র যেন নিজে নিজে চলতে সক্ষম হয় ।

birbangla.com

১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিজ্ঞানী প্যাসকেল আবিষ্কার করেন যোগ বিয়োগ করার একটি যন্ত্র । প্যাসকেল এই পিতা একজন সরকারি চাকুরীজীবী ছিলেন । তাকে কর আদায়ের হিসাব রাখতে হতো । ঐ হিসাব করার ব্যাপার টা কি ঝামেলার এবং কষ্টের তা বাবা কে দেখে বুঝলেন প্যাসকেল । তাই তিনি গবেষণা করে আবিষ্কার করে ফেললেন যোগ বিয়োগ যন্ত্র । তিনি তার আবিষ্কৃত যন্ত্রের নাম দেন ” প্যাসকালিন ” ।যোগ বিয়োগ ছাড়াও আরও অন্যান্য হিসেব করা যায় এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন জার্মান বিজ্ঞানী লাইবনিতজ।

birbangla.com

যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক চার্লস ব্যাবেজ কম্পিউটারের আবিষ্কারের একশো বছর আগে মুল সূত্র বর্ননা করেন । তাই তাকে আধুনিক কম্পিউটারের জনক বলা হয়। তিনি বললেন, যন্ত্রের মাধ্যমে জটিল অংক করা সম্ভব । তিনি ১৮৩৩ থেকে ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দ পর্জন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে আবিষ্কার করলেন এনালাইটিক্যাল মেশিন । এটাকেই পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার বলা হয় । তার কম্পিউটারে ছিল ৩ টি অংশ যথা- ১। স্টোর বা ভাণ্ডার , ২। মিল বা কারখানা , ৩। সিকোয়েন্সিয়াল মেকানিজম বা পর্জায়ক্রমিক যান্ত্রিক কাজ । তাছাড়া ব্যাবেজের যন্ত্রে ছিল মেমরি বা স্মৃতি । ১০০ টি সংখ্যা এতে জমা থাকতো । এর ১০০ বছর পর হাওয়ার্ড এইকেন যে আধুনিক কম্পিউটার তৈরি করেন তারও ছিল তিনটি উপাদান । যথাঃ ১। ম্যাগেটিক কোর, ২। রেজিস্টার এবং ৩। প্রোগ্রাম । তিনি এটি করেছিলেন ব্যাবেজ কে অনুসরণ করেই । ব্যাবেজের ছাত্রী বাইরন কন্যা এডা বাইরোন ব্যাবেজের আবিষ্কৃত কম্পিউটার এর জন্য কিছু নির্দেশ রচনা করেন । তাই তাকে ” পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামার ” বলে আখ্যায়িত করা হয়।

birbangla.com

অবশ্য কম্পিউটারে আবিষ্কারের এর পরের গুরুত্বপুর্ন ব্যাক্তি হলেন হার্মেন হলারিথ । যুক্ত্রাস্টের সংবিধান অনুযায়ী প্রতি ১০ বছর অন্তর অন্তর দেশের লোক গণনা করার নিয়ম । ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে লোক গণনার কাজ শুরু করে তা ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্জন্ত শেষ করা সম্ভব হলও না । তাই ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের গণনায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার যন্ত্রের সাহায্যে লোক গণনার ইচ্ছা প্রকাশ করে । কিন্তু তেমন যন্ত্র তখন ছিল না । ২৫ বছর বয়সী পরিসংখ্যান বিদ হলারিথ আবিষ্কার করেন তেমন একটি যন্ত্র । নাম দেন ” সেন্সাস মেশিন ” । এটা বিশ্বের প্রথম ডাটা প্রসেসিং যন্ত্র ।

birbangla.com

এ যন্ত্রের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বুঝে হলারিথ ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ট্যাবুলেটিং মেশিন কোম্পানি গঠন করেন । এটি সহ কয়েকটি কোম্পানি একত্রিত হয়ে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে আই.বি.এম (IBM) প্রতিষ্ঠা করা হয় ।

birbangla.com

১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাওয়ার্ড এইকেন স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল কম্পিউটার তৈরির কাজে হাত দেন । সে দেশের নৌ বাহিনী তাকে একাজে সহায়তা করে । ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি কম্পিউটার ” সার্ফ-১ “এর কাজ সমাপ্ত করতে সমর্থ হন ।

birbangla.com

তবে এই কম্পিউটারের দৈর্ঘ্য ছিল ৫১ ফুট , উচ্চতা ৮ ফুট । প্রোগ্রামিঙয়ের জন্য এতে ছিদ্র করে টেপ ব্যাবহার করা হয়েছিল। ভিতরের কাজ ছিল ইলেক্ট্রো ম্যাগ্নেটিক্যাল বা বিদ্যুত চৌম্বকীয় । এই কম্পিউটারের কোন মেমরি ছিল না । আর এটি দ্বারা কোন তথ্য ও জমা রাখা সম্ভব হতো না .।

birbangla.com

প্রথম যে ইলেক্ট্রনিক্স কম্পিউটার তৈরি হল তার নাম ” এনিয়াক ” । ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে এটি তৈরি করেন জে প্রেস্পার এর্কাট জুনিয়র এবং জন ডাব্লিউ মকলিকে । মকলিকে পেনসিলভানিয়া বিস্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিক্যাল বিভাগের শিক্ষক ছিলেন । তার ছাত্র এর্কাট জন কে সঙ্গে নইয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় এনিয়াক তৈরি করেন । ” মার্ক – ১ ” এর চেয়ে এনিয়াক আকারে বেশ ছোট ছিল ।

birbangla.com

এনিয়াকের ওজন ৩০ টন বা ২৭ হাজার কেজি । দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট , প্রস্থ ২০ ফুট। ১৫০০ বর্গ ফুট জায়গার দরকার ছিল এটি স্থাপনের জন্য এবং সাথে প্রয়োজন হয়েছিল ১৮ হাজার টিউব । প্রতিদিন অন্তত ২ হাজার টিউব নষ্ট হয়ে যেত । আর মেশিন চালু রাখার জন্য তা প্রতি মাসেই বদলাতে হত। এজন্য ৬ জন কর্মী সব সময় নিয়োজিত থাকতো । এনিয়াক প্রতি সেকেন্ডে ৫ হাজার সংখ্যা যোগ করতে সক্ষম ছিল ।

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে জন ভন নিউম্যান এক গবেষণায় কম্পিউটার প্রোগ্রামিঙের তত্ত্ব প্রকাশ করেন । আগে প্রোগ্রামিঙের কাজ করা হত তারের সংযোগ খুলে । প্রতিবার ভিন্ন ভাবে লাগাতে হতো । মকলি ও এর্কাট জন ভন নিউম্যানের ধারনার উপর ভিত্তি করে তৈরি করে এদ্ভাক । এটি অবশ্য পুরপুরি মেমরি নির্ভর না । পুরো মেমরি নির্ভর কম্পিউটার এডসাক তৈরি হয় ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে । ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানিরা এটি আবিষ্কার করেন ।

birbangla.com

১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে মকলি ও এর্কাট কম্পিউটার ইউনিভাক তৈরি করেন । এ কম্পিউটার প্রথম কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয় । ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ” ইউনিভাক – ১ ” কিনে নেয় আয়াপ্লায়েন্স পার্ক নামে একটি প্রতিষ্ঠান ।

birbangla.com

ট্রাঞ্জিস্টর আবিষ্কৃত হল। এটি ব্যাবহারে বিজ্ঞানী গন প্রথমে কোন সুবিধা করতে না পারলেও ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে তারা তৈরি করেন ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট বা আই সি । এর ঠিক ১০ বছর পর কম্পিউটার প্রযুক্তির আরও উন্নতি হল। তৈরি হল মাইক্রো প্রসেসর । বর্তমানে একেকটি মাইক্রো প্রসেসরে ১ কোটির উপর ট্রান্সিস্টার আছে । কম্পিউটার প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এর আকারেও পরিবর্তন এসেছে । আগে যেখানে স্থাপন করতে বিশাল জায়গার প্রয়োজন হত এখন তা ছোট টেবিলের এক কোনায় কিংবা হাতে বহন করার মত রূপ নিয়েছে । এর গতি বা প্রসেসিং ক্ষমতা ও বেড়েছে কয়েক হাজার গুন ।

এই ছিল কম্পিউটার আবিষ্কারের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস । আশা করি আপনাদের সকলের ভালো লেগেছে । আমার এই লেখা চলবে সাপ্তাহিক ভাবে । আমার পরের লিখনি তে পাবেন কম্পিউটারের প্রজন্ম বা জেনারেশন সম্পর্কে কিছু বিস্তর আলোচনা ।
আপনাদের সকল পরামর্শ , অনুরোধ কিংবা অভিযোগ আমাদের কে নিচে কমেন্ট এর মাধ্যমে জানান ।

 

শেয়ার করুন:

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on whatsapp
Share on email
Share on print

আরও পড়ুন:

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
১৮,৪৫৬,৬৬৫
সুস্থ
১১,৬৯০,৬৭০
মৃত্যু
৬৯৭,৪৩৫

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০