বুধবার, ২১শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
৫ই আগস্ট, ২০২০ ইং
১৪ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী
ads

১০ বছরে চালের দাম সর্বনিম্ন

চালের দাম কমে আসায় ক্রেতাদের মধ্যে স্বস্তি থাকলেও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক। গত এক সপ্তাহে চালের দাম গড়ে ৫ শতাংশ কমেছে। এতে দেশের বাজারে বর্তমান দর গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। চালের দাম তলানিতে ঠেকায় লোকসানে পড়েছেন কৃষক। এ পরিস্থিতিতেই ঘনিয়ে আসছে আমন মৌসুম। তাই এবার নতুন ধানের দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছেন তারা।

বর্তমানে মোটা চাল ২৫ টাকা, মাঝারি ৩২ ও সরু চাল ৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় চালের সরবরাহ বাড়ছে। এবার বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলন হয়েছে। তা ছাড়া আমন মৌসুম ঘনিয়ে আসায় কৃষক চাল বিক্রি বাড়িয়েছেন।

এতে বাজারে চালের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উদ্বৃত্ত চাল রপ্তানির সুযোগ চান মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা। তবে বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে চালের দাম কম থাকায় রপ্তানির সুযোগ কম। এ ক্ষেত্রে মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ বাড়াতে পারে সরকার। পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তারা।

বর্তমানে দেশের বাজারে খুচরায় প্রতি কেজি মোটা চাল গুটি ও স্বর্ণা ২২ থেকে ২৭ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তা ছাড়া বিআর-২৮ ও লতাসহ অন্যান্য মাঝারি মানের চাল ৩০ থেকে ৩৫ এবং মিনিকেটসহ অন্যান্য সরু চাল ৪১ থেকে ৪৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে রাজধানীর খুচরা বাজারে কেজিতে দু-এক টাকা ব্যবধান রয়েছে। এই বাজারে নাজিরশাইল চাল ৫২ থেকে ৬০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বাইরে চালের দাম বেশ কমে গেছে। বাগেরহাট মোল্লাহাটের দারিয়ালা বাজারের সিকদার এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়ী আতাউর রহমান জানান, প্রতি কেজি মোটা চাল ২২ থেকে ২৪ টাকা, মাঝারি চাল ৩০ ও সরু চাল ৪১ থেকে ৪২ টাকা কেজিতে বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, গত ১০ বছরে এত কম দামে চাল বিক্রি করেননি তিনি। তার দোকান থেকে কোনো ক্রেতাকে ফেরত দেন না। সীমিত লাভ হলেই চাল বিক্রি করে দিচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারেও একই দরে চাল বিক্রি হচ্ছে। রংপুর বিভাগীয় বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী প্রতি কেজি মোটা চাল ২৩ থেকে ২৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বর্তমানে ধানের দাম অনেক কম। অনেক জায়গায় ৫০০ টাকার কমে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে। এ নিয়ে সরকার চিন্তিত। একসময় চালের ঘাটতি ছিল। তখনও কৃষকরা কষ্ট করেছেন। এখন অনেক উদ্বৃত্ত থাকায় ধান ও চালের দাম পাচ্ছেন না। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন খারাপ। তিনি কৃষককে ধান ও চালের ন্যায্য দাম দিতে চান। এ জন্য কী করা যায়, প্রধানমন্ত্রী ভাবছেন। আমরাও ভাবছি। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, এখন চালের দাম বেশ কম। তবে গত বছর চালের গড় দর ছিল গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তখন প্রতি কেজি চাল মোটা ৪৪ টাকা, মাঝারি ৪৭ ও সরু ৫৯ টাকা ছিল। বোরো ধান ওঠার আগে আকস্মিক বন্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এই দর বৃদ্ধি পেয়েছিল। এতে গত বছর মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫ ও সরু নাজিরশাইল চালের দর ৭০ থেকে ৭২ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। তবে ২০১৭ সালে গড় দর ছিল মোটা চাল ৪০ টাকা, মাঝারি চাল ৪৬ ও সরু চাল ৫৩ টাকা। আগের দুই বছর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে চালের দাম কিছুটা কম ছিল। এ দুই বছর কেজিপ্রতি গড় দর মোটা ২৯ টাকা, মাঝারি ৩৬ ও সরু ৪৪ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চালের গড় দর ছিল মোটা ৩০ থেকে ৩৩, মাঝারি ৩৫ থেকে ৪০ ও সরু ৪৩ থেকে ৪৬ টাকা কেজি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় মোটা চাল প্রতি কেজি সর্বনিম্ন ২৮ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর তখন সরু চাল সর্বনিম্ন ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ৪৫ টাকায় পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, এবার বোরো মৌসুমে কৃষক ৪৭০ থেকে ৪৮০ টাকা দরে ধান বিক্রি করেছেন। ফলে লোকসান দিয়ে তাদের ধান বিক্রি করতে হয়েছে। এদিকে, বর্তমানে মিলগেটে প্রতি কেজি সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২১ টাকা, মাঝারি চাল ২৭ থেকে ২৯ ও সরু চাল ৩৮ থেকে ৪০ টাকায়। পাইকারি বাজারেও কম দামে বিক্রি হচ্ছে চাল। রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে পাইকারিতে এখন প্রতি কেজি মোটা চাল ২৩ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া মাঝারি চাল ২৮ থেকে ৩১ ও সরু চাল মিনিকেট ৩৯ থেকে ৪১ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে নাজিরশাইল ৪৪ থেকে ৪৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ সমকালকে বলেন, বর্তমানে কৃষকের কাছে ও মিলে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত চাল রয়েছে। এ কারণে দাম কমেছে। কৃষককে চালের ন্যায্যমূল্য দিতে চাইলে উদ্বৃত্ত চাল রপ্তানি করতে হবে। এখন এটাই সমাধানের মূল পথ। কৃষক ও চাল ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করছে সরকার। এতে চালের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। এখন উদ্বৃত্ত চালের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে রপ্তানি চালু হলে এ সমস্যা সমাধান হবে বলে মনে করেন তিনি। আমন মৌসুম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এবার আমনেও বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে রপ্তানির বাজার খুঁজতে হবে।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সমকালকে বলেন, যে খরচে চাল উৎপাদন হচ্ছে, সে তুলনায় রপ্তানি মূল্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত। বর্তমানে সরকার ৮০ ভাগ চাল ও ২০ ভাগের কম ধান সংগ্রহ করছে। অনেক সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ হয় না। এ ক্ষেত্রে ধান কেনা বাড়াতে পারে সরকার। কৃষকের দোরগোড়া থেকে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে খাদ্য কর্মকর্তাদের সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে ধানের উৎপাদন ব্যয় কমানো ছাড়া উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে শ্রমের উচ্চ মূল্য দিতে গিয়ে ব্যয় বাড়ছে। ধানের উৎপাদন ব্যয় কমাতে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় যন্ত্র কেনার সুযোগ সহজ করে দিতে হবে। এ জন্য কৃষকদের ঋণ দিতে হবে, যাতে কম খরচে ধানের উৎপাদন হয়। উৎপাদন খরচ কম হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করার সুযোগ তৈরি হবে।

দেশের মতো বিশ্ববাজারেও এখন চাল কম দামে বিক্রি হচ্ছে। ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে প্রতি টন চালের মূল্য ৩৩৫ থেকে ৪০০ ডলার। এ হিসাবে প্রতি কেজির দাম পড়ছে ২৮ থেকে ৩৪ টাকা। চলতি অর্থবছরে সরকারি পর্যায়ে কোনো চাল আমদানি হয়নি। তবে বেসরকারি পর্যায়ে সুগন্ধি ও ব্র্যান্ডের চাল আমদানি হয়েছে চার হাজার টন।

শেয়ার করুন:

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on whatsapp
Share on email
Share on print

আরও পড়ুন:

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
১৭৮,৪৪৩
সুস্থ
৮৬,৪০৬
মৃত্যু
২,২৭৫

বিশ্বে

আক্রান্ত
১৮,৬৯১,৬৮৬
সুস্থ
১১,৯০৯,১৯৬
মৃত্যু
৭০৩,৩৭৪

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১